বাংলাদেশে স্টারলিংক এবং মোবাইল ব্রডব্যান্ড চালুর সিদ্ধান্তের বাস্তবতা কী?
বাংলাদেশ সরকার স্টারলিংক চালু করার পরিকল্পনা করছে এবং কিছুদিন আগেই একটি পরীক্ষামূলক ব্যবহার করেছে, যেখানে স্টারলিংক ব্যবহার করে ২৩০ Mbps পর্যন্ত ব্যান্ডউইথ পাওয়া গেছে। আমি, একজন আইএসপি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক হিসেবে, এই বিষয়ে আমার একান্ত মতামত প্রকাশ করতে চাই, যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের জন্য উপযোগী হবে।
বিটিআরসি'র খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী
বিটিআরসি'র খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্টারলিংককে বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে ব্যবহার করেই ব্যান্ডউইথ রাউট করতে হবে। অনেকেই মনে করেন, গত জুলাই-অগাস্ট মাসে দেশের ইন্টারনেট বন্ধ ছিল আইএসপি’র কারণে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ওই সময় ইন্টারনেট বন্ধের কারণ ছিল আন্তর্জাতিক গেটওয়ে সমস্যাজনিত, যা আইএসপি থেকে হয়নি। এখন যদি স্টারলিংক একই গেটওয়ে ব্যবহার করে ইন্টারনেট সরবরাহ করে, তাহলে দাবি করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে কেউ ইন্টারনেট বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু এটি পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ, সরকার যদি কখনো ইন্টারনেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে স্টারলিংকের রুটও বন্ধ হয়ে যাবে।
এখন যদি বলা হয় স্টারলিংককে বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে ব্যবহার করতে হবে না, তাহলে কিছু গুরুতর সমস্যা দেখা দেবেঃ
**১. ডাটা গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাঃ অন্য কোনো গেটওয়ে ব্যবহার করলে বাংলাদেশের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি সংস্থাগুলোর হাতে চলে যেতে পারে এবং তারা চাইলে তথ্য পরিবর্তন বা বিকৃতও করতে পারে।
**২. নিষিদ্ধ কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণঃ বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব বেটিং সাইট, পর্নোগ্রাফিক সাইট, ক্যাসিনো সাইট ও ডার্ক ওয়েব ব্লক করে রাখা হয়েছে, স্টারলিংক যদি স্থানীয় আইজিডব্লিউ ব্যবহার না করে, তাহলে এসব সাইট সহজেই তাদের গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এর ফলে দেশে এক অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হবে—একদিকে স্থানীয় আইএসপি গ্রাহকদের জন্য এসব সাইট নিষিদ্ধ থাকবে, অন্যদিকে স্টারলিংক ব্যবহারকারীরা সহজেই এসব সাইট অ্যাক্সেস করতে পারবে।
স্টারলিংকের বিনিয়োগ কতটা বাস্তব?
বেশ জোরেশোরেই বলা হচ্ছে, স্টারলিংক বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু আমি মনে করি, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক প্রচারণা। স্টারলিংক বাংলাদেশে কোনো স্যাটেলাইট তৈরি করবে না, উৎক্ষেপণও করবে না, এমনকি এখানে কোনো উৎপাদন কারখানাও স্থাপন করবে না। শুধুমাত্র বাংলাদেশের আকাশসীমার বাইরে তাদের নিম্ন-কক্ষপথ স্যাটেলাইট ঘুরবে, যার ফলে বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশনও কোনো রাজস্ব পাবে না। তাহলে বিনিয়োগটা কোথায়?
স্টারলিংকের ব্যবসার মূল ধরন হলো: কিছু কোম্পানি স্টারলিংকের রিসেলার হতে চাইছে, যাদের প্রত্যেককে প্রায় ৬ কোটি টাকা অগ্রিম প্রদান করতে হবে, যাতে তারা ১,০০০টি ডিভাইস আমদানি করে বিক্রি করতে পারে। অর্থাৎ, টাকা বাংলাদেশে আসছে না, বরং বাংলাদেশ থেকে টাকা চলে যাচ্ছে। এরপর প্রতি মাসে স্টারলিংকের ব্যবহারকারীদের ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে হবে, যা পুরোপুরি বিদেশে চলে যাবে। যেহেতু স্টারলিংক কোনো টাওয়ার নির্ভর নয়, বরং স্যাটেলাইট নির্ভর, তাই এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে না। অর্থাৎ, পুরো অর্থই বিদেশে চলে যাবে।
বাংলাদেশের বর্তমান ব্রডব্যান্ড পরিস্থিতি
আমি একজন আইএসপি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক হিসেবে দেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে চাই। বর্তমানে বাংলাদেশের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নেই, এমন জায়গার সংখ্যা ৫% এর বেশি হবে না। অর্থাৎ, দেশের ৯৫% এলাকাতেই উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ রয়েছে। এই অবকাঠামো সম্পূর্ণ দেশীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।
সরকারি হিসাবে দেশে দেড় কোটি ব্রডব্যান্ড সংযোগ রয়েছে, তবে প্রকৃত সংখ্যা ৪ কোটির কম হবে না বলে আমার ধারণা। গড়ে প্রতি বাসায় ৪ জন করে থাকলে অন্তত ১২ কোটি মানুষ এই সেবার আওতায় আছে। এমন একটি দেশে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি, সেখানে ২৪ ঘণ্টা ইন্টারনেট সেবা দেওয়া এক প্রকার যুদ্ধের মতো। এই যুদ্ধের সৈনিকরা অন্তত ৫ লাখ, এবং তাদের পরিবার মিলিয়ে ২০ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এত বড় দেশীয় বিনিয়োগের পরও বিদেশিরা যখন দেখে এখানে একটি সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে, তখন তারা লবিং শুরু করেছে কীভাবে এখান থেকে অর্থ বের করে নেওয়া যায়।
মোবাইল অপারেটর ও স্টারলিংকের হুমকি
আমরা ইতিহাস থেকে জানি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের পরাধীন করেছিল ২০% ব্রিটিশ সৈন্য ও ৮০% স্থানীয় সৈন্য ব্যবহার করে। একইভাবে, বর্তমানে দেশের কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বিদেশি টেলিকম ও স্টারলিংককে সুবিধা পাইয়ে দিতে চাইছে। আপনি কি জানেন, এই দেশীয় ব্রডব্যান্ড ব্যবসার মূল্য কত? ৪ কোটি গ্রাহক যদি গড়ে ৫০০ টাকা খরচ করে, তাহলে মাসিক ২,০০০ কোটি টাকা বা বাৎসরিক ২৪,০০০ কোটি টাকা।
মোবাইল অপারেটর ও স্টারলিংক যদি এই ব্যবসায় প্রবেশ করে, তাহলে ২০ লাখ মানুষের জীবিকা ধ্বংস হবে এবং প্রতিবছর ২৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাবে। আমি রিফর্ম কমিটির মিটিংয়ে এই বিষয়টি তুলে ধরেছি, এবং আমাদের বিটিআরসির অনেকেই বিষয়টি বুঝেছেন ও একমত হয়েছেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তির বক্তব্য শুনলেই বোঝা যায়, মোবাইল অপারেটররা তাদের কিনে ফেলেছে। কেউ কেউ বলছে, "সব যদি একই থাকে, তাহলে রিফর্ম কোথায়?" আমি রেগে বলেছি, "অনেকেই তো গত সরকারের আমলে বিয়ে করেছেন, তার মানে কি নতুন রিফর্ম মানে আবার বিয়ে করা?"
সমাধান কী?
স্টারলিংক কি বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে ব্যবহার করবে? উত্তর: না। যদি সত্যিই ইন্টারনেট মুক্ত রাখতে হয়, তবে এটি ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে স্টারলিংককে একটি *সেকেন্ডারি অপশন* হিসেবে রাখা যেতে পারে, যেখানে এটি অনুমোদিত নির্দিষ্ট এলাকায়, নির্দিষ্ট কাজের জন্য চালু করা হবে।
অনেকেই হয়তো ট্যগ দিবার চেস্টা করবেন আমি সরকার বিরোধী কিনা।
আমি সরকারবিরোধী নই
গত জুলাই-অগাস্ট মাসে আমি দেশের সংকট নিয়ে সোচ্চার ছিলাম। আমার ভাইদের হত্যার নিন্দা জানিয়ে বিচার চেয়েছি। আইসিটি খাতের আর কোন ব্যাক্তি আমার থেকে বেশি পাব্লিকালি সোচ্চার ছিলো কিনা আমার জানা নাই। তবে জুলাই আগাস্ট এর পরে অনেক সমন্বয়ক নামে সুযোগ সন্ধানী আমার চোখে পরেছে। আমি এমনকি মন্ত্রীর সামনে বসেই তাঁর সমালোচনা করেছি। ফেসবুক এ স্ট্যাটাস দিয়েছি। বিটিআরসি’র ভিতরেই মন্ত্রির মিটিং চলা অবস্থায় আমাকে রুম এর বাইরে নিয়ে শটগানের গুলিতে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে, আমার ব্যাবসা বন্ধের হুমকিও পেয়েছি, কিন্তু চুপ থাকিনি। আমি সবসময় সত্যের পক্ষে থাকতে চাই। রিফর্ম কমিটির সুপারিশ যদি গোপন রাখা হয়, এবং আমাদের সুপারিশ যদি আমলে না নেয়া হয়, তবে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করি।
আমি জানি আমার এই বক্তব্য সরকারবিরোধী মনে হতে পারে, আমাদের চিফ অ্যাডভাইজর এবং আমাদের BIDA চেয়ারম্যান আশিক ভাইয়ের স্টেটমেন্ট বিরুদ্ধেও যেতে পারে। তবে আমার মতে, তারা কেউই প্রযুক্তিগত বিষয়ে দক্ষ নন। তারা এসব বিষয় বোঝেন না। তাদেরকে আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত আমলারা যেমনভাবে বোঝান, তারা সেভাবেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।
৫ লাখ ভাই যখন জিবিকা হারাবে তাদের কে কি এই দেশ নতুন আয়ের ব্যাবস্থা করে দিতে পারবে? এই ২০ লাখ মানুষের খুদার জালায় কি আরেকটা শেয়ার কেলেংকারীর মতো ধস নামবে না? জিবিকা না পেয়ে এদের অনেকেই কি অপরাধে জরিয়ে যাবে না? অনেকেই কি সন্তান এর মুখে খাবার না দিতে পেরে নিজের গলায় ফাস লাগাবে না?
এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। লক্ষ লক্ষ মানুষের আয়ের ওপর আঘাত হানার মতো সিদ্ধান্ত। বুজে শুনে পদক্ষেপ নিন।
বড় টাকার কাছে আমরা সব সময় হেরে যাই। এখানে বিদেশি শক্তির হাতে অনেক বড় টাকা রয়েছে। তাদের টাকার ভারে হয়তো কাল ঘুম থেকে উঠে দেখব আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, হয়তো আমার এসোসিয়েশন এ পরিচালক বসিয়ে দিয়ে আমাদের আল্লাহ হাফেজ করা হবে, হয়তো আমার কোম্পানির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়ে যাবে, হয়তো কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় আমি মারা গেছি দেখা যাবে। কিন্তু সবাই জানুক, বছরে এই ২৪ হাজার কোটি টাকা আমাদের রক্তের ঘামঝরা টাকা— এটি আমাদের দেশের টাকা, এটি আমাদের দেশেই থাকা উচিত। সত্যের জয় হোক।
সরাসরি Muhammad Yunus sir, Chief Adviser GOB, এবং Ashik Chowdhury ভাই এর হস্তক্ষেপ আসা করছি।
................................
সাকিফ আহমেদ
পরিচালক
আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ISPAB)।
-----(সোর্স - ফেইসবুক পোস্ট)
T Time Trend এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url